পদ্মার বুকে দেশের বৃহত্তম ব্যারেজ!


​বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই পরিবেশ উন্নয়নের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদকে খরা, নদীর নাব্যতা সংকট এবং ভয়াবহ লবণাক্ততার হাত থেকে রক্ষা করতে পদ্মা নদীর ওপর একটি মেগা ব্যারাজ নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে আগামী সাত বছরের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। গত বুধবার ঢাকার শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় বহুল প্রতীক্ষিত এই ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়। মেগা এই প্রকল্পটিকে দেশের অর্থনীতি, কৃষি ও পরিবেশের জন্য এক যুগান্তকারী ও মাস্টারমাইন্ড পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সরকার।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি কমিটির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই বিশাল উন্নয়ন কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৃতপ্রায় পাঁচটি প্রধান নদীকে পুনরায় সচল ও পুনর্জীবিত করা। ভারত সীমান্তবর্তী ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে শুষ্ক মৌসুমে বিশেষ করে মার্চ-এপ্রিলের দিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পদ্মার অববাহিকায় পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যায়। এর ফলে পদ্মার শাখা নদীগুলো সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায় এবং বিস্তীর্ণ কৃষি অঞ্চল মরুভূমিতে রূপ নেয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় উপকূলীয় ও নিকটবর্তী জেলাগুলোতে সমুদ্রের নোনা পানি প্রবেশ করে তীব্র লবণাক্ততার সৃষ্টি করছে, যা চাষাবাদ ও সুপেয় পানির সংকটকে তীব্র করে তুলেছে। অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের কারণে নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এই উভয়মুখী সংকট থেকে স্থায়ী মুক্তির জন্য পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে নকশা করা হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৩ সালের মধ্যে ব্যারাজটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৪টি জেলার পানিসংকট চিরতরে দূর হবে এবং প্রায় সাত কোটি মানুষ সরাসরি এর সুফল ভোগ করবেন। শুধু তাই নয়, এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব তিনটি পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং পরিকল্পিত সাতটি আধুনিক স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছর থেকেই এই প্রকল্পের প্রথম ধাপের প্রাথমিক কাজ ও ভূমি অধিগ্রহণ শুরু হতে যাচ্ছে।

​সাধারণ মানুষের মনে প্রায়শই প্রশ্ন জাগে, বাঁধ বা ড্যামের সঙ্গে এই ব্যারাজের মূল পার্থক্য কোথায়? পানি ও নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ব্যারাজ’ হলো নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নদীর আড়াআড়িভাবে নির্মিত একটি বিশেষ গেটযুক্ত সুউচ্চ কাঠামো। সাধারণ ড্যাম বা বাঁধের সঙ্গে এর মূল কার্যগত পার্থক্য হলো—বাঁধের মাধ্যমে নদীর পানিপ্রবাহকে সম্পূর্ণ বন্ধ করে এক জায়গায় বিশাল কৃত্রিম জলাধার তৈরি করা হয়, যা অনেক সময় পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে ব্যারাজের মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহকে কখনো পুরোপুরি বন্ধ করা হয় না; বরং একাধিক নিয়ন্ত্রিত গেট বা দরজার সাহায্যে পানির উচ্চতা ও গতিপথকে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সাধারণত ব্যারাজ নির্মাণের মূল কৌশলের অংশ হিসেবে এর উজানে বেশ কিছু কৃত্রিম সংযোগ খাল (Link Canals) খনন করা হয়। শুষ্ক মৌসুমে যখন নদীতে পানি কমে যায়, তখন ব্যারাজের গেটগুলো আংশিক বা পূর্ণ বন্ধ করে পানির উচ্চতা বাড়ানো হয় এবং সেই জমাকৃত পানিকে কৃত্রিম খালের মাধ্যমে শুষ্ক বা খরাপ্রবণ অঞ্চলের নদী ও কৃষি জমিতে ডাইভার্ট করা হয়। পরবর্তীতে পাম্পের সাহায্যে সেই পানি বিস্তীর্ণ কৃষি জমিতে সেচের কাজে ব্যবহার করা হয়, যা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমায়।

​বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. আনিসুল হক এই মেগা প্রকল্পের গুরুত্ব ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, যথাযথ হাইড্রোলজিক্যাল ও পরিবেশগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সঠিক ভৌগোলিক স্থানে ব্যারাজ নির্মাণ করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক পরিবেশ, মৎস্য চাষ ও কৃষির জন্য বৈপ্লবিক সুফল বয়ে আনে। নদী অববাহিকায় বছরজুড়ে পানির সুষম বণ্টন নিশ্চিত হলে ইলিশসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছের বংশবিস্তার বাড়বে এবং লবণাক্ততা দূর হওয়ায় ফসলের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি মেগা স্ট্রাকচার। যদি সঠিক পলি ব্যবস্থাপনা (Silt Management) এবং পরিবেশগত প্রভাবের দিকগুলো কঠোরভাবে তদারকি করা না হয়, তবে ব্যারাজের উজানে অতিরিক্ত পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সঠিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করা না গেলে বড় অঙ্কের জাতীয় অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি মূল নদীরও ক্ষতি হতে পারে।

​ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে নদীর ওপর ব্যারাজ বা রেগুলেটর নির্মাণের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে আশির দশকে, বিশেষ করে ১৯৮৩ সালে মৌলভীবাজারে মনু নদীর ওপর দেশের প্রথম মাঝারি আকারের ব্যারাজ নির্মিত হয়েছিল। পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকে উত্তরবঙ্গের কৃষি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর ওপর দেশের বৃহত্তম ‘তিস্তা ব্যারাজ’ এবং ঠাকুরগাঁওয়ে টাঙ্গন নদীর ওপর ‘টাঙ্গন ব্যারাজ’ তৈরি করা হয়েছিল, যা ওই অঞ্চলের মঙ্গা ও খরা দূর করতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। তবে সামগ্রিক ব্যপ্তি, বিপুল অঙ্কের বাজেট, ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উপকারভোগীর বিশাল সংখ্যার দিক থেকে বিচার করলে, প্রস্তাবিত এই ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্পটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ, আধুনিক এবং অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী নদী ব্যবস্থাপনা ও ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়ন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে আশা করছেন নীতিনির্ধারকেরা।


ডেস্ক রিপোর্ট


أحدث أقدم