পর্দা উঠল ২০২৬ বিশ্বকাপের, এবারের আসরে নতুন কী কী থাকছে?



সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মেক্সিকোর ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠেছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর। শুরু হয়ে গেছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও মর্যাদাপূর্ণ সিংহাসন দখলের লড়াই। এবারের বিশ্বকাপটি ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে। কারণ, মাঠের ফুটবল, দলের সংখ্যা, ভেন্যু থেকে শুরু করে নিয়মকানুন—সবকিছুতেই বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ফিফা নিয়ে এসেছে নজিরবিহীন পরিবর্তন।

​বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো আসর একক বা দ্বৈত দেশ নয়, বরং তিনটি দেশের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উত্তর আমেরিকার তিন পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা যৌথভাবে এই মেগা টুর্নামেন্টের আয়োজন করছে। এর আগে ২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করলেও তিন দেশের অংশীদারিত্বে এটাই প্রথম। টুর্নামেন্টের সিংহভাগ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে, আর মেক্সিকো ও কানাডায় ভাগ করে দেওয়া হয়েছে বাকি ম্যাচগুলো। তিন দেশের মোট ১৬টি বিশ্বমানের স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে মেক্সিকোর 'এস্তাদিও আজতেকা' বিশ্বের প্রথম স্টেডিয়াম হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের অনন্য কীর্তি গড়ল। অন্যদিকে, আগামী ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির বিখ্যাত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে এই বিশ্বযজ্ঞের ফাইনাল ম্যাচ।

​এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে এর দলের সংখ্যায়। ১৯৯৮ সালের পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ৩২ দলের যে চেনা ফরম্যাটে বিশ্বকাপ হয়ে আসছিল, তা ভেঙে এবারই প্রথম ৪৮টি দেশ মূল পর্বে অংশ নিচ্ছে। ফুটবলকে বিশ্বব্যাপী আরও ছড়িয়ে দিতে এবং ছোট দেশগুলোকে সুযোগ করে দিতে ফিফা এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দল বাড়ার কারণে মহাদেশীয় কোটাতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। এবার ইউরোপ থেকে ১৬টি, আফ্রিকা থেকে ৯টি, এশিয়া থেকে ৮টি, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ৬টি এবং ওশেনিয়া অঞ্চল থেকে সরাসরি ১টি দল খেলার সুযোগ পাচ্ছে। স্বাগতিক ৩ দেশসহ উত্তর ও মধ্য আমেরিকা অঞ্চল থেকে থাকছে ৬টি দল। বাকি দুটি দল নির্ধারিত হয়েছে মহাদেশীয় প্লে-অফ টুর্নামেন্টের মাধ্যমে।

​দল বাড়ার কারণে ম্যাচের সংখ্যা এবং গ্রুপ পর্বের ফরম্যাতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। কাতার বিশ্বকাপে যেখানে মোট ম্যাচ হয়েছিল ৬৪টি, এবার ম্যাচ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১০৪টিতে। ৩৯ দিন ব্যাপী এই টুর্নামেন্টে ৪৮টি দলকে মোট ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে, যেখানে প্রতি গ্রুপে থাকছে ৪টি করে দল। আগে গ্রুপ পর্বের পর সরাসরি 'রাউন্ড অব ১৬' বা নকআউট পর্ব হতো, তবে এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে 'রাউন্ড অব ৩২'। ১২টি গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স-আপ এবং সব গ্রুপ মিলিয়ে সেরা ৮টি তৃতীয় স্থান অধিকারী দল এই রাউন্ডে প্রবেশ করবে। নতুন এই নিয়মের কারণে যেকোনো দলকে ট্রফি জিততে হলে আগের ৭টি ম্যাচের জায়গায় এখন থেকে মোট ৮টি ম্যাচ খেলতে হবে।

​২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠের খেলাকে আরও নিখুঁত ও আকর্ষণীয় করতে ফিফা বেশ কিছু আধুনিক প্রযুক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে। কাতার বিশ্বকাপের চেয়েও এবার আরও দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে অফসাইড লাইনের সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য উন্নত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। সেই সাথে বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বলে এমন আধুনিক সেন্সর ব্যবহার করা হচ্ছে যা রিয়েল-টাইমে ডাটা পাঠাবে, ফলে বল লাইনের বাইরে গেছে কি না বা হ্যান্ডবল হয়েছে কি না, তা মুহূর্তেই জানা যাবে। এছাড়া তিন দেশের বিশাল দূরত্বের কারণে ফুটবলারদের ক্লান্তি কমাতে এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে ফিফা 'আঞ্চলিক ক্লাস্টার' তৈরি করেছে, যাতে গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতে দলগুলোকে খুব বেশি দূর ভ্রমণ করতে না হয়।

​ফুটবলের দল বাড়ায় অনেকের মনেই প্রশ্ন ছিল খেলার মান কমবে কি না। তবে উদ্বোধনী পর্ব এবং গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচগুলোর উন্মাদনা বলে দিচ্ছে—লড়াই এবার হবে আরও তীব্র। ছোট দেশগুলোর বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার ক্ষুধা এবং পরাশক্তিদের আধিপত্য ধরে রাখার লড়াই—সব মিলিয়ে ২০২৬ উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও জমকালো আসর হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


Previous Post