শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলা বর্তমানে পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙনের মুখে এক চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন। গত কয়েক বছর ধরে পদ্মার ভাঙনপ্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা, আবাদি জমি, ঘরবাড়ি এবং জনগুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গত বছরের ভয়াবহ ভাঙনের ক্ষত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি স্থানীয় বাসিন্দারা এবং অনেকেই এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে ব্যর্থ হয়েছেন। নতুন বর্ষায় পদ্মার পানি ও স্রোত বাড়তে শুরু করায় এলাকাবাসীর মধ্যে আবারও চরম আতঙ্ক ও ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নদীর মাঝখানে বিশাল ডুবচর সৃষ্টি হওয়ার ফলে পদ্মার স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং মূল স্রোতধারা সরাসরি জাজিরা তীরের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির এই অস্বাভাবিক গতিপথ ও ঘূর্ণিস্রোত তীররক্ষা প্রকল্পের স্থাপনাগুলোর ওপর প্রবল আঘাত হানছে।
জাজিরার ভাঙন প্রতিরোধে ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০২ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। নির্মাণাধীন তীররক্ষা বাঁধে প্রায় ৬৪ মিটার গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে এবং ভাঙন রোধে ডাম্পিং করা ৫ লাখ ৮৭ হাজার জিও ব্যাগের অধিকাংশই নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় ৩০ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট হয়েছে।
বর্ষার আগেই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা সম্পন্ন হয়নি; কোথাও কাজের গতি অত্যন্ত ধীর, আবার কোথাও এখনো কাজ শুরুই হয়নি। প্রকল্পের এই ধীরগতির পেছনে প্রশাসনিক জটিলতাকে দায়ী করেছে শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড পাউবো। সংস্থাটির দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত অংশের নকশা পরিবর্তনের পর প্রকল্পের প্রায় দুই কিলোমিটার অংশের অনুমোদন পেতে মন্ত্রণালয়ে বিলম্ব হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এই দুই কিলোমিটার অংশের কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৬০ কোটি টাকা, যা আগামী বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা নদীতীরের বাসিন্দারা কাজের ধীরগতিতে চরম হতাশ। তারা জানান, গত বছরের ভাঙনে অসংখ্য পরিবার তাদের বসতভিটা ও জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ অংশের কাজ শেষ না হলে গত বছরের মতো আবারও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান জানান, প্রকল্পের একটি অংশের অনুমোদন পেতে বিলম্ব হওয়ায় কাজ কিছুটা পিছিয়েছে। তিনি আরও বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে এবং ভাঙনের ঝুঁকি কমাতে পাউবো সচেষ্ট রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ অংশে দ্রুত কাজ শেষ করে স্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করা হোক, যাতে প্রতি বর্ষায় ভাঙনের আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাতে না হয়। এছাড়া বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, কেবল জিও ব্যাগ বা সাময়িক ডাম্পিং নয়, বরং নদী বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। জাজিরাকে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে এবং প্রতি বর্ষার এই ভাঙন আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেতে দীর্ঘমেয়াদী এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
নিজস্ব প্রতিবেদক
.jpeg)