খান বাহাদুর খলিলুর রহমান নির্মিত ছয়গাঁও জমিদার বাড়ি শরীয়তপুরের এক দর্শনীয় স্থাপত্য



শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার ছয়গাঁও ইউনিয়নের ছয়গাঁও গ্রামে প্রায় নয় দশক ধরে দাঁড়িয়ে আছে একটি অনন্য ঐতিহাসিক স্থাপনা—খান বাহাদুর খলিলুর রহমান সিকদারের বাসভবন। এটি অনেকের কাছে ‘ছয়গাঁও জমিদার বাড়ি' নামেও পরিচিত । ব্রিটিশ শাসনামলে, ১৯৩৪ সালে নির্মিত এই ভবনটি শরীয়তপুর জেলার অন্যতম সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন স্থান হিসেবে বিবেচিত। এমন সুন্দর ও ঐতিহ্যবাহী জমিদারতুল্য বাড়ি বাংলাদেশে খুব কমই আছে। এখানে সরাসরি এসে নিজ চোখে দেখলে যে কারো মন জুড়িয়ে যায়।


বাড়ির সামনে রয়েছে বিস্তৃত খোলা প্রাঙ্গণ, পেছনে নানা প্রজাতির ফল-ফলাদির বাগান, একপাশে বড় সুপারি বাগান আর শান বাঁধানো ঘাটওয়ালা একটি বিশাল পুকুর, যা এই স্থানের সৌন্দর্যে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা।

 

ভবনের দেয়ালে সংযুক্ত একটি প্রস্তরফলকে ইংরেজিতে খোদাই করা আছে -

“This Building was built in 1934 to perpetuate the memory of Sagfarunnesa Begum, who died in Calcutta on Friday, the 6th January, 1933 and was buried in Gobra By her bereaved Husband H. M. Khalilur Rahaman”


এর মাধ্যমে জানা যায়, ভবনটি নির্মিত হয়েছিল খলিলুর রহমানের স্ত্রী সাগফরুন্নেসা বেগমের স্মৃতি অক্ষয় করে রাখার উদ্দেশ্যে। ১৯৩৩ সালের ৬ জানুয়ারি কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয় এবং গোবরায় তাঁকে সমাহিত করা হয়। শোকাহত স্বামী পরবর্তীতে স্ত্রীর স্মরণে এই ভবন নির্মাণ করান। ফলকটিও কলকাতা থেকেই তৈরি করা হয়েছিল, যা থেকে বোঝা যায় সেখানেও পরিবারটির স্থায়ী বসতি ও যথেষ্ট সহায়-সম্পত্তি ছিল।


স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত আছে, খলিলুর রহমান ছিলেন একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল তিনি যেন গ্রামের জন্য কিছু করেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর সেই দাবিরই প্রতিফলন ঘটে এই স্মৃতিসৌধসম ভবন নির্মাণের মাধ্যমে।


এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন প্রখ্যাত নেতার সঙ্গে এই বাড়ির সংশ্লিষ্টতা ছিল। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত এখানে ব্রিটিশ ভারত সরকারের একটি সেনাঘাঁটি স্থাপিত হয়েছিল এবং তৎকালীন সন্ত্রাস দমনের নামে বহু শিখ সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল—যা প্রমাণ করে সে সময় এই জনপদের রাজনৈতিক গুরুত্ব কতটা ছিল।


১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গেও এই বাড়ির সম্পর্ক রয়েছে। ভেদরগঞ্জে গঠিত সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো এই বাড়িতেই। অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য ও স্থানীয় নেতাদের পরিচালনায় ছাত্র-যুবক ও শ্রমিক-কৃষকরা এখানে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে এই বাড়িটি শুধু স্থাপত্য-নিদর্শন নয়, বরং জাতীয় ইতিহাসের নানা পর্বের সাক্ষীও বটে।


ভবনটির সামনে রয়েছে পরিবারের নিজস্ব কবরস্থান ও বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা। খলিলুর রহমানের ভ্রাতুষ্পুত্র, শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ছাবেদুর রহমান খোকা সিকদারের নিবিড় তত্ত্বাবধানে বাড়িটির ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উজ্জ্বলতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।


ভবনটি ছয়গাঁও বাংলাবাজারের সাথে অবস্থিত। এর সামনে রয়েছে ছয়গাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ৫ নং ছয়গাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যা স্থানটিকে সহজে চিহ্নিতযোগ্য করে তুলেছে। 


শরীয়তপুর সদর থেকে বাসে আটো রিক্সা, সিএনজি বা রিক্সার মাধ্যমে এখানে পৌঁছানো যায়৷ শরীয়তপুর কোর্টে সামনেই ছয়গাঁও আসার জন্য বিভিন্ন যানবাহন পাওয়া যাবে। দুরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। 


এই ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিনিয়ত মানুষ ছুটে আসেন এবং উপভোগ করেন এর ইতিহাস, স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সঠিক সংরক্ষণ, প্রচারণা ও পর্যটন-সুবিধা বৃদ্ধি করা গেলে খান বাহাদুর খলিলুর রহমান সিকদারের এই বাসভবন কেবল শরীয়তপুর নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে



লেখা - সালমান ফারদিন



 

أحدث أقدم