জীবনের বাঁকে বইঠার লড়াই: মেঘনার চরে ২৫ বছর খেয়া বাইছেন তাসলিমা



২৬ বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া নৌকার বইঠা হাতে তুলে নেন তাসলিমা। মেঘনার শাখানদীর এক পার থেকে অপর পারে মানুষ ও কৃষিপণ্য পারাপার করে তাঁর জীবিকা নির্বাহ হয়।


ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে চার সন্তানকে নিয়ে যখন অথই সাগরে পড়েছিলেন, তখন অথই নদীকেই জীবনের শেষ আশ্রয় বানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। যেখানে পুরুষদেরই টিকে থাকা দায়, সেখানে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে মেঘনার উত্তাল শাখানদীতে নৌকার বইঠা হাতে লড়াই করে যাচ্ছেন এক অদম্য নারী—তাসলিমা বেগম (৬৫)। শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর ইউনিয়নের হাজীপাড়া এলাকার এই বাসিন্দার জীবনের গল্প যেকোনো সিনেমার চেয়েও নাটকীয় ও বেদনাবিধুর।

​প্রায় ২৬ বছর আগে স্বামী নাসির সরদার মারা যান। চার সন্তানকে নিয়ে অথই সাগরে পড়েন তাসলিমা। কোনো কূল-কিনারা না পেয়ে সন্তানদের মুখে অন্ন জোগাতে বাধ্য হয়ে স্বামীর রেখে যাওয়া নৌকার হাল ধরেন তিনি। চরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া মেঘনার শাখানদীতে শুরু হয় তাঁর জীবনযুদ্ধ। নদী পারাপার করলেও তাসলিমা সাধারণত যাত্রীদের কাছ থেকে নগদ টাকা পান না। বিনিময় প্রথার মতো চরাঞ্চলের কৃষকেরা ফসলের মৌসুমে তাঁকে ধান, চাল, মরিচ বা অন্যান্য কৃষিপণ্য দিয়ে থাকেন। সেই ফসল বিক্রি করেই দীর্ঘ আড়াই দশক ধরে চলছে তাঁর কষ্টের সংসার।

​এই ভাঙা নৌকার আয়েই তিনি তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে বড় করেছেন, দিয়েছেন বিয়েও। ভেবেছিলেন শেষ বয়সে এসে হয়তো একটু সুখের মুখ দেখবেন। কিন্তু ৫ বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলে পঙ্গু হয়ে যান। ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে জমানো সবটুকু সম্বল হারিয়ে তাসলিমা আজ পুরোপুরি নিঃস্ব।

​দীর্ঘ ২৫ বছর হাজারো মানুষকে নদীর এক কূল থেকে অন্য কূলে নিরাপদে পৌঁছে দিলেও, তাসলিমার নিজের জীবনের কূল মেলেনি। এত বছর হাড়ভাঙা খাটুনি করার পরও নিজের এক খণ্ড জমি বা মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়নি তাঁর। বর্তমানে অন্যের জমিতে একটি জরাজীর্ণ ঘর তুলে কোনোমতে রাত পার করছেন। সরকারি অনুদান হিসেবে কেবল একটি বিধবা ভাতাই জোটে তাঁর ভাগ্যে।

​চোখের জল মুছতে মুছতে তাসলিমা বেগম বলেন, "জীবনভর মানুষকে নদী পার করলাম, কিন্তু নিজের একখান ঘর বানাইতে পারলাম না। এখন শেষ বয়সে এসে একটাই আকুতি—সরকার যদি সন্তানদের থাকার জন্য আর আমার মরার পর কবরের জন্য অন্তত একটুকরো জমি দিত, তবে শান্তিতে মরতে পারতাম।"

​স্থানীয় কোদালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান তাসলিমা বেগমের এই দীর্ঘ লড়াইয়ের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, তাঁর মানবিক দিক বিবেচনা করে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে খেয়াঘাটের ইজারা মওকুফ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে সাহায্য-সহযোগিতা করা হয়। এছাড়া সরকারিভাবে তাঁকে যেন একটি খাস জমি বা প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর বরাদ্দ দেওয়া যায়, সে বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

​মেঘনার ঢেউয়ের সাথে লড়াই করা তাসলিমা বেগম চরের মানুষের কাছে কেবল একজন খেয়াচালক নন, তিনি এক অপরাজেয় মাতৃসত্তার প্রতীক। চরের বাসিন্দারা চান, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই সংগ্রামী নারী যেন অন্তত একটু সম্মান ও স্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই পান।



Next Post Previous Post