শরীয়পুরের সন্তান সিরাজ সিকদার: বিপ্লবী নাকি চরমপন্থী?


শরীয়তপুরের এক হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস। আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগের কথা। বাংলাদেশ তখন নতুন স্বাধীন হয়েছে। চারদিকে যেমন খুশির আমেজ, তেমনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অভাব-অনটন আর রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে মানুষের মনে ছিল নানা কষ্ট। সেই কঠিন সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঝড়ের মতো এসেছিলেন এক তরুণ। তার একটি ডাকে তৎকালীন সরকারের ভিত কেঁপে উঠত, আর তার কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল দেশের হাজারো তরুণ। তিনি আর কেউ নন—সিরাজ সিকদার।


​ইতিহাসের বইয়ে তার নাম এখন আর তেমন দেখা যায় না। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের কয়জন আমরা জানি যে, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় এবং বিতর্কিত এই মানুষটি ছিলেন আমাদের এই শরীয়তপুরেরই সন্তান? হ্যাঁ, তৎকালীন মাদারীপুর মহকুমা আর আজকের শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ থানার লাকর্তা গ্রামে ছিল সিরাজ সিকদারের পৈতৃক বাড়ি ও স্থায়ী ঠিকানা।


​আজকের শান্ত শরীয়তপুরের তরুণদের কাছে সিরাজ সিকদারের জীবন এক মস্ত বড় বিস্ময়। তিনি কি আসলেই গরিব মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করা এক মহান ‘বিপ্লবী’ ছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এক ‘চরমপন্থী’? কোনো রাজনৈতিক অন্ধত্ব ছাড়া, আজ আমাদের এই মাটির সন্তানের জীবনের গল্পটি সহজভাবে জানা প্রয়োজন। দিনশেষে তিনি ভালো ছিলেন নাকি মন্দ—সেই বিচার করবেন পাঠক নিজেই।


কে এই সিরাজ সিকদার?

​১৯৪৪ সালের ২৭শে অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন সিরাজুল হক সিকদার, যিনি পরবর্তীতে ‘সিরাজ সিকদার’ নামে পরিচিত হন। তার বাবা রাজ্জাক সিকদার ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। বাবার চাকুরির কারণে সিরাজ সিকদারের ছোটবেলা দেশের বিভিন্ন জেলায় কাটলেও, তার নাড়ির টান এবং স্থায়ী ঠিকানা ছিল শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ থানার লাকর্তা গ্রামে।


​ছোটবেলা থেকেই সিরাজ সিকদার ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তিনি বরিশাল জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। এরপর তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমান বুয়েট)-এ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম শ্রেণীতে ডিগ্রি লাভ করেন।


​আজকের দিনে একজন বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ারের সামনে যেমন বিলাসী জীবনের সুযোগ থাকে, তখনও তা ছিল। সিরাজ সিকদার চাইলে সরকারি বড় চাকুরি করে বা বিদেশে গিয়ে অনেক টাকা আয় করতে পারতেন। কিছুদিন তিনি চাকুরিতে যোগও দিয়েছিলেন। কিন্তু যার মনে গরিব মানুষের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন ছিল, তাকে কি আর চাকুরির চার দেয়ালে আটকে রাখা যায়? বুয়েটে পড়ার সময় থেকেই তিনি ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন।


​নতুন দল ও ‘পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন’

​ষাটের দশকের শেষের দিকে পুরো বিশ্বে এক বৈপ্লবিক হাওয়া বইছিল। বিশেষ করে চীনের কমিউনিস্ট নেতা ماو সেতুং (মাও সেতুং)-এর চিন্তাভাবনা তরুণদের খুব আকর্ষণ করত। মাও সেতুং মনে করতেন, অস্ত্রের জোর ছাড়া ক্ষমতা বা অধিকার আদায় করা সম্ভব নয়। এই কথাটি তরুণ ইঞ্জিনিয়ার সিরাজ সিকদারের মনে গভীরভাবে গেঁথে যায়।


​তিনি দেখলেন, তৎকালীন বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো কেবল ভোট আর নির্বাচনের রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ত। কিন্তু গ্রামের গরিব কৃষক, চরের খেটে খাওয়া মানুষ আর কারখানার শ্রমিকদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। সিরাজ সিকদার ভাবলেন, কেবল মুখে কথা বলে বা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে সাধারণ মানুষের মুক্তি আসবে না; এর জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হবে।


​এই লক্ষ্য নিয়ে ১৯৬৮ সালের ১লা জানুয়ারি ঢাকাতে তিনি তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন’। এটি একটি গোপন (সংগঠন) ছিল। সিরাজ সিকদার একটি বড় গবেষণাপত্র তৈরি করেন, যেখানে তিনি বলেন—পূর্ব বাংলার মানুষকে মুক্ত করতে হলে শহরের আরাম-আয়েশ ছেড়ে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের সংগঠিত করতে হবে এবং জমিদার ও শোষকদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করতে হবে।


​১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন পাকিস্তানি বাহিনী এদেশের মানুষের ওপর আক্রমণ শুরু করে, তখন সিরাজ সিকদার চুপচাপ বসে থাকেননি। তবে তার যুদ্ধের কৌশল ছিল অন্যদের চেয়ে আলাদা। ১৯৭১ সালের ৩রা জুন, যুদ্ধের ভেতরেই বরিশালের বানারীপাড়া ও ঝালকাঠির সীমান্তবর্তী ‘পেয়ারা বাগান’ এলাকায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি’


​এই পেয়ারা বাগান এলাকাটি ছিল নদী, নালা আর ঘন গাছে ঘেরা এক দুর্ভেদ্য জঙ্গল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষে এই বাগানের ভেতরে ঢোকা ছিল অসম্ভব। সিরাজ সিকদার এই জঙ্গলকে ব্যবহার করেই তার দলের গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলেন।


​এখানেই ইতিহাসের এক জটিল অধ্যায় শুরু হয়। সিরাজ সিকদার মনে করতেন, পাকিস্তানের হাত থেকে মুক্ত হয়ে ভারতের দালালি করা যাবে না। তার চোখে তৎকালীন প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযুদ্ধ ছিল এক শোষকের হাত থেকে অন্য শোষকের হাতে ক্ষমতা বদলের খেলা। তাই ১৯৭১ সালে সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টিকে তিন দিকে যুদ্ধ করতে হয়েছিল:


পাকিস্তানি সেনাবাহিনী: যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সর্বহারা পার্টি পেয়ারা বাগান এলাকা মুক্ত রেখেছিল।

স্থানীয় রাজাকার: যাদেরকে সিরাজ সিকদারের নির্দেশে শাস্তি দেওয়া হতো।

মুজিব বাহিনী বা মূলধারার মুক্তিযোদ্ধা: ভারতের বিরোধিতা করতে গিয়ে কিছু জায়গায় সর্বহারা পার্টির সাথে মুক্তিযোদ্ধাদেরও সংঘর্ষ হয়েছিল।


​১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। চারদিকে যখন নতুন দেশের আনন্দ, তখন সিরাজ সিকদার তার সর্বহারা পার্টি নিয়ে আড়ালেই রয়ে গেলেন। তিনি এই স্বাধীনতাকে ‘প্রকৃত স্বাধীনতা’ বলে মানতে চাইলেন না। তার মতে, পাকিস্তান আমলের শোষকদের জায়গায় এখন দেশী শোষকরা এসে বসেছে।


​১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল—স্বাধীন বাংলাদেশের এই সময়টা ছিল খুব অস্থির। চারদিকে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি আর তার ওপর ১৯৭৪ সালে দেশে দেখা দেয় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। লাখ লাখ মানুষ যখন না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছিল, তখন সিরাজ সিকদার মনে করলেন এটাই বিপ্লবের আসল সময়।


​এই সময় সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি এক ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। তাদের মূল কাজ ছিল:


থানা আক্রমণ: দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে রাতের আঁধারে police (পুলিশ) ফাঁড়ি ও থানা আক্রমণ করে অস্ত্র লুট করা।


ব্যাংক ও হাট-বাজার লুট: দলের খরচের জন্য বড় বড় সরকারি ব্যাংক এবং খাজনা আদায়ের জায়গা লুট করা।


শ্রেণীশত্রু খতম: সিরাজ সিকদারের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী যারা দুর্নীতিবাজ, শোষক, মজুতদার বা সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতা—তাদেরকে ‘শ্রেণীশত্রু’ নাম দিয়ে একের পর এক হত্যা করা।


​এই সব কারণে তৎকালীন শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের কাছে সিরাজ সিকদার হয়ে ওঠেন এক নম্বর সমস্যা। এই সশস্ত্র আন্দোলন দমন করতে সরকার তখন ‘জাতীয় রক্ষী বাহিনী’ গঠন করে। একদিকে সর্বহারা পার্টির গোপন হামলা, অন্যদিকে রক্ষী বাহিনীর কঠোর অভিযান—সব মিলিয়ে পুরো দেশে এক থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।


​সেই অন্ধকার রাত: ইতিহাসের প্রথম ‘ক্রসফায়ার’

​১৯৭৪ সালের শেষের দিকে সরকার সিরাজ সিকদারকে ধরার জন্য দেশজুড়ে গোয়েন্দা লাগায়। অবশেষে ১৯৭৫ সালের ১লা জানুয়ারি চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকার একটি গোপন আস্তানা থেকে গোয়েন্দারা সিরাজ সিকদারকে গ্রেপ্তার করেন। ধারণা করা হয়, দলের ভেতরেরই কেউ টাকার লোভে তার খবর পুলিশকে দিয়ে দিয়েছিল। গ্রেপ্তারের পর সেইদিনই তাকে বিমানে করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।


​পরদিন, অর্থাৎ ২রা জানুয়ারি, ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে রাতের আঁধারে পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা যান সিরাজ সিকদার। তার এই মৃত্যু নিয়ে দুটি ভিন্ন গল্প চালু আছে:


সরকারি গল্প: পুলিশের দাবি ছিল, গ্রেপ্তার হওয়া সিরাজ সিকদার স্বীকার করেছিলেন যে সাভার এলাকায় তাদের গোপন অস্ত্রের ভাণ্ডার আছে। ২রা জানুয়ারি গভীর রাতে পুলিশ যখন তাকে নিয়ে সাভারে যাচ্ছিল, তখন সর্বহারা পার্টির অন্য সদস্যরা পুলিশকে আক্রমণ করে সিরাজ সিকদারকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। দুপক্ষের গোলাগুলির মাঝখানে পড়ে গাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের গুলিতে তিনি মারা যান। (আজকের দিনে আমরা যে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’-এর গল্প শুনি, তার শুরু কিন্তু হয়েছিল ৫০ বছর আগে এই সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই)।


পরিবার ও গবেষকদের দাবি: সিরাজ সিকদারের পরিবার এবং নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদদের মতে, সাভারের বন্দুকযুদ্ধের গল্পটি ছিল সম্পূর্ণ সাজানো নাটক। আসলে ঢাকা আনার পর তাকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। এরপর তাকে রক্ষী বাহিনীর সদর daptare (দপ্তরে) নিয়ে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয় এবং সাভারের নির্জন রাস্তায় লাশ ফেলে রেখে 'ক্রসফায়ার'-এর নাটক সাজানো হয়। ৩রা জানুয়ারি ঢাকার মোহাম্মদপুর কবরস্থানে পুলিশ পাহারায় চুপিসাড়ে তাকে দাফন করা হয়।


​“কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?”: সংসদে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ

​সিরাজ সিকদারকে হত্যার পর তৎকালীন সরকার ভেবেছিল সমস্যা শেষ। কিন্তু এর মাত্র ২৩ দিন পর, ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে এক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে।


​সেইদিন সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে একদলীয় ‘বাকশাল’ শাসন ব্যবস্থা চালু করা হয়। দেশের মাত্র ৪টি সরকারি পত্রিকা রেখে বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেইদিন সংসদে দাঁড়িয়ে এক দীর্ঘ ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

​ভাষণের একপর্যায়ে তিনি ক্ষোভের সাথে উচ্চস্বরে বলে ওঠেন—“কোথায় আজ সিরাজ সিকদার?”


​একটি স্বাধীন দেশের সংসদে দাঁড়িয়ে, পুলিশের হেফাজতে মারা যাওয়া একজন নাগরিককে নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ নেতার এই কথাটি আজীবন এক বড় বিতর্কের জন্ম দেয়। বিরোধীদের চোখে এটি ছিল একজন একনায়কের দম্ভ, আর সমর্থকদের চোখে এটি ছিল দেশের শান্তি নষ্টকারীদের প্রতি রাষ্ট্রের এক কঠোর হুঁশিয়ারি।


সন্ত্রাসী নাকি বিপ্লবী?

​আজ এত বছর পর, আমাদের এই শরীয়তপুরের সন্তান সিরাজ সিকদারকে আমরা কীভাবে মনে রাখব? আমরা তার চরিত্রের ভালো-মন্দ দুটি দিকই নিচে সহজ করে তুলে ধরছি।

তিনি কোনো সাধারণ চোর-ডাকাত ছিলেন না। বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ার হয়েও নিজের সব সুখ-আরাম ত্যাগ করে চরের ও গ্রামের গরিব মানুষের জন্য আন্ডারগ্রাউন্ডের কষ্টকর জীবন বেছে নিয়েছিলেন।

তিনি ক্ষমতার লোভ করেননি। ১৯৭১ সালে সরকারের সাথে হাত মেলালে তিনি স্বাধীন দেশে বড় মন্ত্রী বা আমলা হতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজের আদর্শের প্রশ্নে আপস করেননি।


সমাজ পরিবর্তনের নামে তিনি যে সশস্ত্র পথ বেছে নিয়েছিলেন, তা একটি সদ্য স্বাধীন দেশের শান্তির জন্য ছিল মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।


‘শ্রেণীশত্রু খতম’-এর নামে তার দল যেভাবে কোনো বিচার ছাড়াই গ্রামীণ জোতদার বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের হত্যা করত, তা কোনো সভ্য সমাজ সমর্থন করতে পারে না।


যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে ব্যাংক ডাকাতি বা থানা লুট করার ফলে দেশের অর্থনীতি আরও ভেঙে পড়েছিল এবং সাধারণ মানুষের কষ্ট বেড়েছিল।

যে মানুষটি নিজের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়া, কেবল গরিব মানুষের মুক্তির জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিলেন—তিনি কি একজন দেশপ্রেমিক ‘বিপ্লবী’? নাকি সমাজকে অস্থিতিশীল করার অপরাধে একজন ‘চরমপন্থী’? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব আপনাদের ওপরই রইল।


​ব্যক্তি সিরাজ সিকদারের রাজনীতি ভালো না মন্দ—তা নিয়ে সমাজে হাজারো বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয়ে আমাদের সবাইকে একমত হতে হবে, তা হলো—আইনের শাসন


​সিরাজ সিকদারকে যখন গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, রাষ্ট্র তাকে আদালতে তুলতে পারত। দেশের প্রচলিত আইনে যদি তার ফাঁসির রায় হতো, তবে তাকে আইনের শাসন বলা যেত। কিন্তু রাষ্ট্র তা করেনি। রাষ্ট্র তাকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে, কোনো বিচার ছাড়াই রাতে গুলি করে হত্যা করেছে।


​এই বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ডটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের বুকে এক মস্ত বড় কালো দাগ। সিরাজ সিকদারকে এভাবে হত্যা করার মাধ্যমে রাষ্ট্র যেন এই নিয়ম তৈরি করে দিল যে—ক্ষমতায় থাকলে আইনের বাইরে গিয়ে যেকোনো মানুষকে মেরে ফেলা যায়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির খেসারত বাংলাদেশ পরবর্তীতে বছরের পর বছর ধরে দিয়েছে। পরবর্তীতে আমরা দেখেছি কীভাবে ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে হাজার হাজার মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে। আজ যদি ১৯৭৫ সালে সিরাজ সিকদার হত্যার সুষ্ঠু বিচার হতো, তবে হয়তো পরবর্তীতে এদেশে আর কোনো মায়ের বুক (ক্রসফায়ারের) নামে খালি হতো না।

​সিরাজ সিকদার ভালো ছিলেন নাকি মন্দ—ইতিহাস তার বিচার করবে। কিন্তু শরীয়তপুরের সন্তান হিসেবে, আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে তার সঠিক ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। তিনি ভেদরগঞ্জ থানার লাকর্তা গ্রামের পৈতৃক শিকড় থেকে উঠে গিয়ে একসময় পুরো দেশের রাজনীতি কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন।


​আমরা চাই, স্বাধীন এই বাংলাদেশ এমন হোক - যাতে আর কোনো ‘সিরাজ সিকদার’ যেন বুয়েট থেকে পাস করে আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে অস্ত্র তুলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ না করে। 



​প্রধান তথ্যসূত্রসমূহ (Bibliography):

সিরাজ সিকদার ও পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি — সুলтан সিকদার (২০১২)।

বাংলাদেশ: দ্য আনফিনিশড রেভোলিউশন — লরেন্স লিফশুলজ (ইউরোপীয় সংস্করণ)।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি — বদরুদ্দীন ওমর।

জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণী আর্কাইভ — ২৫শে জানুয়ারি, ১৯৭৫।

মামলা নথিপত্র (নং- ১৭১/৯২) — ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

অনুসন্ধানমূলক ভিডিও ডকুমেন্টারি — দ্য পোস্ট (the POST), ২০২৫।



লেখা : সালমান ফারদিন



নবীনতর পূর্বতন